টাকা-পয়সা ও সম্পদ অর্জনের নাম রাজনীতি নয়

গাহর্স্থ অর্থনীতি কলেজ ছাত্রলীগের সম্মেলনে ও. কাদের সভাপতি জেসমিন, সাধারণ সম্পাদক পাপিয়া

টাকা-পয়সা ও সম্পদ অর্জনের নাম রাজনীতি নয়


প্রকাশঃ 26-11-2016

aligকাগজ অনলাইন প্রতিবেদক: টাকা-পয়সা ও সম্পদ অর্জনের নাম রাজনীতি নয় বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি। তিনি বলেন আওয়ামী লীগে অপরাজনীতি ও দুর্নীতির শিক্ষা দেয়া হয় না। টাকা-পয়সা ও বিত্ত সম্পদ বড় সম্পদ নয়। সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মেধা। তা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই অর্জন করতে হয়।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ মিলনায়তনে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফারজানা আক্তার সূপর্নার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাসুমা আক্তার পলি’র সঞ্চালণায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর নিশাত পারভীন। সম্মেলনের উদ্ধোধন করেন ছাত্রলীগ সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ, প্রধান বক্তার বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন।
সম্মেলন শেষে আগামী ১ বছরের জন্য কলেজে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে জেসমিন আরা রুমাকে সভাপতি ও পাপিয়া ইসলাম রুপুকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। এছাড়া ঝুন্নুন সাকি ও মরিয়ম আক্তার হীরাকে সহসভাপতি, হিফফাত আরা খানম হানি ও শারমিন সুলতানা মনিকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ইফফাত সাদিয়া আহমেদ নিশু ও নাজনিন আক্তারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
ওবায়দুল কাদের বলেন, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতিবিদ হতে চায় না। ভাল ছেলে-মেয়েরা রাজনীতিতে না এলে খারাপ লোকেরা রাজনীতিতে জায়গা করে নেবে এবং এমপি-মন্ত্রী হবে। মেধাবীরা রাজনীতিতে না এলে মেধাহীনরা এবং হাইব্রিডরা রাজনীতি দখল করে নেবে। সে রাজনীতি সাধারণ মানুষের কোন উপকারে আসবে না। রাজনীতিকে ঘৃনা করলে নিজেরই ক্ষতি করা হবে। কারণ এক সময় নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতে ভালো লাগবে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, রাজনীতিতে শুদ্ধাচার কৌশল গ্রহণ করা উচিত। কেননা নিজে শুদ্ধ না হলে অন্যকে শুদ্ধ হওয়ার পরামর্শ দিয়ে লাভ নেই। নিজে দুর্নীতি করে অন্যকে দুর্নীতি বন্ধ করার কথা বললে কোন লাভ হবে না। তাই আগে নিজেকে দুর্নীতি করা বন্ধ করতে হবে, তারপর অন্যকে দুর্নীতি না করার কথা বলতে হবে।
ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ বলেন, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পতাকাবাহী ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই ২০১৭ সালে দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করা হবে। এজন্য ছাত্রলীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দায়িত্বশীল ভ‚মিকা রাখার আহŸান জানান তিনি।
সম্মেলনের শুরুতে ওবায়দুল কাদের, ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পতাকা, বেলুন এবং কবুতর উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
সম্মেলণে উপস্থিত ছিলেন, ছাত্রলীগের সহসভাপতি কাজী এনায়েত, ডা. তোফাজ্জেল হক চয়ন, আরিফুর রহমান লিমন, আমিনুল ইসলাম, মশিউর রহমান শরীফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার মো. নিজামুল হক, দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা প্রমূখ।

ডিজিটাল লেনদেনে দুর্নীতি কমেছে : অর্থমন্ত্রী

ডিজিটাল লেনদেনে দুর্নীতি কমেছে : অর্থমন্ত্রী

২৭ নভেম্বর ২০১৬,

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম আয়োজিত ডিজিটাল পেমেন্ট-বিষয়ক কর্মশালায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ছবি : এনটিভি

ডিজিটাল লেনদেন চালু হওয়ায় অনেক সরকারি অফিসে দুর্নীতি কমে গেছে বলে জানালেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

আজ রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম আয়োজিত ডিজিটাল পেমেন্ট-বিষয়ক কর্মশালায় অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান।

মুহিত বলেন, দুর্নীতি কমানোর খুবই কার্যকর পদক্ষেপ ডিজিটালাইজেশন। সরকারের ডিজিটাল পেমেন্টের উদ্যোগের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতি কমছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া আগামী দুই বছরের মধ্যে সরকারি সব লেনেদেন কাগজবিহীন করার চেষ্টা চলছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

ডিজিটাল পেমেন্ট আগামী দিনে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন কর্মশালার বক্তারা।

সুত্রঃ এনটিভি

দুর্নীতি : প্রতিরোধ ও প্রতিকার

দুর্নীতি : প্রতিরোধ ও প্রতিকার
শেখ আকরাম আলী

images-3দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে গিয়েছি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে তাদের কর্মতৎপরতার সাথে পরিচিত হয়েছি। সেসব অভিজ্ঞতার আলোকে পাঠকদের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চাই। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য দলিলের অভাব। তাই দুর্নীতির ইতিহাস জানতে হবে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে প্রতিরোধ ও প্রতিকার।

গত ৯ ডিসেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস। খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে একটি খবর। শিরোনাম ‘সরকারদলীয়দের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কথা পায় না দুদক।’ দুর্নীতি দমন ব্যুরোর নাম এখন ‘স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন’। স্বাধীন মানে, স্বাধীনতা। স্বাধীনের উল্টো পিঠে পরাধীন। পরাধীন থাকতে থাকতে স্বাধীন মানসিকতা নিয়ে কাজ করা কষ্টকর। মনের গোপন বন্দরে অধীনতার যে ছায়া লুকানো থাকে, মনোজগতের কন্দরে যে ‘দাসসুলভ’ ছবি আঁকা থাকে, সেখানে যে মনোছবি তৈরি হয় সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। আমলাতন্ত্রে টেলিফোন ধরে বড় কর্তার অমৃত বচন শুনতে শুনতে ‘জি স্যার, হ্যাঁ স্যার’ কতবার যে বলা হয়; বাড়ির ছেলেমেয়ে স্ত্রী এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘স্বাধীন’ বললেই স্বাধীনতা আসে না। এখান থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। তাই কবি নির্মলেন্দু গুণ কবিতা লিখেছেন- ‘স্বাধীনতা পেলে আমি পরাধীন হতে ভালবাসি।’

দাসসুলভ মানসিকতা আমরা অর্জন করেছি পলাশী যুদ্ধের পরে। সুবেহ বাংলায় মানুষ ও জমির প্রভুত্ব দুই স্তরে ছিল। ওপরের স্তরে মোগল শাসক শ্রেণী এবং নিচের স্তরে বড় বড় পরগনার রাজস্ব আদায়কারী ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, পাঠান, রাজপুত ও ক্ষেত্রী জমিদারেরা। কিন্তু মূলে যাদের স্পষ্ট দেখা যায়, তারা হলেন মোগল। মোগল মনসবদার শ্রেণীভুক্ত প্রধান প্রধান মুসলমান ও হিন্দু রাজপুরুষ এবং জগৎ শেঠ গোষ্ঠী। তারা খাল কেটে কুমির আনায় দীর্ঘ দিন ইংরেজ আমাদের শাসন ও শোষণ করতে পেরেছে। এর ধারাবাহিকতায় এলো ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ভয়াবহ জমি এবং খাজনা দুর্নীতির প্রথম সোপান, যা আজো চলছে। মহাভারতের কবি বক্তা এবং শাস্ত্রকাব্যের অবতার কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সম্পর্কে বলা হয়, মহাভারতের ইতিহাস তার পক্ষে লেখা সম্ভব হয়েছে এ কারণেই যে, কুরু বংশের সাথে তার নিজের জীবনের যোগ ছিল। তিনি ক্ষেত্রজ নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে হস্তিনাপুরের অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের জনক এবং বেশ কিছু দিন হস্তিনাপুরে ছিলেন। সোজা কথা, যিনি ঘটনার সাথে যুক্ত থাকেন তিনিই পারেন ঘটনার সত্যিকারের মূল্যায়ন করতে এবং ইতিহাস তুলে ধরতে। বানিয়ে বানিয়ে লেখা এবং ঘটনায় নিজে সম্পৃক্ত থেকে লেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য। আমি নিজে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করেছি। ৩১-০৮-১৯৯১ দুর্নীতি দমন ব্যুরোর এসিও/পরিদর্শকদের অতিথি বক্তা ছিলাম। প্রথম নিয়োগকৃত টিএনওদের আইনসংক্রান্ত ক্লাস, নিরাপত্তা ও দুর্নীতি বিষয়ে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অ্যাকাডেমিতে অতিথি বক্তা ছিলাম। জেলা দুর্নীতি দমন অফিস পরিদর্শন করেছি এবং প্রতিবেদন দিয়েছি। তাই বলতে পারি, যা লিখেছি তা আমার কর্মের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। আমার লেখা ‘আমলাতন্ত্র এবং আমার আমলা জীবন’ প্রকাশিতব্য বইতে দলিলগুলো সন্নিবেশিত হবে।’
বর্তমান সময়ে একটি বড় কাহিনী হলো গণশুনানি। বিগত ১১ ডিসেম্বর খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে- ‘সাবরেজিস্ট্রারদের ঘাম ছুটিয়ে দিলো গণশুনানি।’

টিভিতে মন দিয়ে প্রোগ্রামটা দেখছিলাম। মনে পড়ল, ১৯৮৪ সালে জেলা প্রশাসক হিসেবে গণশুনানির অভিজ্ঞতা। কাজে যোগ দিয়ে দেখলাম, যারা ডিসি অফিসে কাজের জন্য আসেন তারা অফিসের বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছেন। ডিসি সাহেবের সাথে দেখা করা ‘দিল্লি হনুজ দূর অস্ত’। দিল্লি অনেক দূর। অফিস কক্ষে ৪০টি চেয়ার রাখলাম। তারপর বারান্দায় বের হয়ে বললাম, ডিসি সাহেবের সাথে দেখা করবেন? আমার সাথে আসুন। আমি নতুন; তাই তারা আমাকে চেনেন না। তাদের সবাইকে চেয়ারে বসিয়ে বসলাম নিজের চেয়ারে।

বললাম, কেন এসেছেন? সমস্যা কী? একজন করে কথা বলছেন। সাথে সাথেই ফাইল তলব। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ফাইল নিয়ে হাজির। সাথে সাথে সিদ্ধান্ত এবং বিদায়। এক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ। একজন ফটোগ্রাফি স্টুডিওর মালিক বললেন, স্যার, প্রশাসন আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের ছবি তুলেছিলাম। বহুবার ডিসি অফিসে বিলের টাকার জন্য ঘুরেছি, টাকা পাইনি।
নাজির সাহেবকে ডাকলাম।
বললাম, টাকা নাই?
নাজির : আছে স্যার।
আমি : ১০ মিনিটের মধ্যে টাকা দিয়ে দেবেন?
ফটোগ্রাফারকে বললাম : উনার সাথে যান। টাকা পেলে আমাকে জানিয়ে যাবেন।
১০ মিনিটের মধ্যে ফটোগ্রাফার ফিরে এলেন।
আমি : টাকা পেয়েছেন?
ফটোগ্রাফার : হ্যাঁ, স্যার। তবে … (আমতা আমতা)।
আমি: তবে টা কী?
ফটোগ্রাফার : টাকা দিয়ে উনি বললেন … (আমতা আমতা) আমার ধৈর্য হারানোর অবস্থা।
বললাম : আমতা আমতা করে নামতা পড়ছেন কেন? উনি কী বললেন? ভয়ের কিছু নেই। ঝেড়ে কাশুন।
ফটোগ্রাফার : উনি বললেন : এখন ফকিরনির পুতরাও সরাসরি ডিসি সাহেবের কাছে চলে যায়।
আমি অবাক, হতবাক, রুদ্ধবাক। মনে পড়ল সেই আপ্তবাক্য ‘শুনহ মানুষ, যে জানহ সন্ধান’। সব কিছু খুলে বলার দরকার নেই। সমঝদারের জন্য ইশারাই কাফি। থলের কালো বেড়াল বের হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে চিত্র পরিচালক অমন কাট কাট করে। এখানে সঞ্চালক ‘কাট কাট’ করে বিজ্ঞাপন বিরতিতে চলে যাবেন। আমরা বিখ্যাত থলে থেকে কালো বিড়াল বের হওয়ার গল্প শুনেছি। কিন্তু এখনো কালো বেড়াল থলে থেকে বের হচ্ছে না।

একটা বিখ্যাত গল্পে আছে, বাবা ছেলের বাসায় থাকেন এবং গভীর রাতে মুদ্রা গোনেন। পুত্রবধূ ভাবেন, শ্বশুর পরলোকে যাত্রা করলে অনেক টাকা পাবেন। সে জন্য শ্বশুর যেন ছেলের বাসা ছেড়ে মেয়ের বাসায় না যান, তাই জোরেশোরে বিপত্নীক শ্বশুরের যত্নআত্তি করতে থাকেন। শ্বশুর একদিন পরলোকে যাত্রা করলেন। তার পুত্রবধূ সবার আগে তার ঘরে প্রবেশ করে থলি খুলে দেখেন মাত্র কতগুলো তামার মুদ্রা। গভীর রাতে এগুলো গুনতেন তিনি। পুত্রবধূর মনে আশার আলো জ্বালাতেন।

দুর্নীতি যখন সমাজের শিরায় শিরায় বসন্তবাতাসের মতো বয়ে যায়, সে সময় শিক্ষা থেকে দীক্ষা, পদক থেকে মাদক, খবরের কাগজ থেকে সংস্কৃতি সবখানে ঘাপটি মেরে থাকে দুর্নীতি। গোলটেবিল থেকে মিটিং মিছিল করে দুর্নীতি রোধ করা যাবে না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির জন্য বুকের রক্ত দিয়েছেন, কিন্তু বিদেশ থেকে আসা পর্যাপ্ত কম্বল থেকে তার নিজের প্রাপ্ত কম্বল খুঁজে পাননি। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতুর মূল কাজ উদ্বোধন করতে যেয়ে বলেছেন, ‘বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ আসলে, গরিবের গরিব হওয়া বড় অপরাধ। আবার বড় শক্তির মুখোমুখি হয়ে প্রতিবাদ করা আরো বড় অপরাধ।

সব সময় বিশ্বাস করে এসেছি। ‘Knowledge is Power’ মানে জ্ঞান মানুষকে সাহস জোগায়। আর ‘জ্ঞান’ পুঁথিপড়া জ্ঞান নয়। তা সমাজ থেকে, অভিজ্ঞতা থেকে, জীবন থেকে আহৃত হয়।

যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে সরকারপ্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সমাসীন। ওই সচিবালয়ে আমার এক সময়ের সহকর্মী তখন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর নগর শাখার দায়িত্বে। তিনি আমার অফিসে এসে বললেন, এরশাদ সাহেব হেলিকপ্টারে আটরশি যাওয়া-আসায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের ১৮ লাখ টাকা ক্ষতি করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার অনুমোদন চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।
আমি : গতকাল ব্যুরোর চিঠি পেয়েছি। স্টাডি করেছি। মামলা হবে না।
কর্মকর্তা : কী বলছেন! বিচারপতি সাহাবুদ্দীন শুধু রাষ্ট্রপতি নন। তিনি এখনো দেশের প্রধান বিচারপতি।

আমি : ১০ মিনিট দয়া করে বসুন। আপনার সামনে ডিকটেশন দিচ্ছি।
স্টেনোগ্রাফারকে ডাকলাম, ডিকটেশন দিলাম। প্রথম কথা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় President’s Priviledge Act 1975 অনুযায়ী বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রাষ্ট্রপতি এবং তার স্ত্রী যে যানবাহন ব্যবহার করবেন, তার খরচ সরকারের। আইনটি সংযুক্ত করলাম। এতেই মামলা খতম হওয়ার কথা। কিন্তু এটা তো গলা টিপে ধরা। তাই নম্বরে যুক্ত করলাম, একজন সাবেক মন্ত্রী গাড়ির জ্বালানি অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি করেছেন। সেই মামলায় রাষ্ট্রপতি আদেশ দিয়েছেন ‘টাকা PDR ACT (Public Demand Recovery) অনুযায়ী আদায় করা হোক’। তিন নম্বরে লিখলাম, তেল হেলিকপ্টারে ব্যবহার করা হোক বা মোটরগাড়িতে ব্যবহার করা হোক, তেল হচ্ছে তেল।

রাষ্ট্রপতির আদেশের ধারাবাহিকতায় এরশাদ সাহেবের বিরুদ্ধে ‘PDR ACT’ অনুযায়ী, অর্থ আদায় করা যেতে পারে। এক যাত্রায় পৃথক ফল হয় না। ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হলো এবং তিনি তিন নম্বর প্রস্তাব ‘PDR ACT’ অনুযায়ী টাকা আদায় অনুমোদন করলেন।
অ্যামস্টারডামে অনুষ্ঠিত পঞ্চম দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্মেলনে বলেছিলাম, উন্নয়নশীল দেশের জন্য দুর্নীতি প্রতিরোধে আলাদা ফর্মুলা দিতে হবে। এখন যদি কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাই, বলব আলাদা ফর্মুলার প্রয়োজন নেই। একই ফর্মুলা। আমরা এখন ব্যাংক বানাচ্ছি, দুর্নীতি করছি। কোম্পানি বানাচ্ছি, জালিয়াতি করছি। আমরা আর উন্নয়নশীল দেশ নই- ওপরে উঠেছি। ক্রমাগত ওপরে উঠব। একদিন ধনী দেশের কাতারে নাম লেখা হবে। ধনী দেশ হবো অথচ ধনী দেশের দুর্নীতি হবে না! ‘আমার যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভিজাবো না’; তা কি হয়?

দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার,গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ

farasuddin-f
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একবিংশ শতাব্দির সূচনায় অনেক ইতিবাচক অর্জনের আকাশে একটি কৃষ্ণপক্ষ ২০০১-২০০৫ সনে পর পর পাঁচবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিঘোষিত দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শিরোপা ধারণ। বার্লিন নগরীতে অবস্থিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের অর্থায়ন প্রশ্নবিদ্ধ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ হলেও কেবলমাত্র ধারণাবশতঃ হিসাব করা সর্বনিকৃষ্ট দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের কলংক কালিমা বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সুখের কথা, ধীরে তবে নিশ্চিতভাবে দুর্নীতির এই প্রশ্নবিদ্ধ মানদন্ডে দেশের অবস্থান এখন চতুর্দশতম (১৪তম) স্থানে উঠে এসেছে। এতে আত্মপ্রসাদের অবকাশ নেই, প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মজিজ্ঞাসাচালিত উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও কর্মকান্ড যাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যায়।

বর্তমান নিবন্ধের শিরোনাম দেখেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীঁকারই মুখ্য। এর কৃতসংকল্প বাস্তবায়নে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। শিরোনামটির একটি পরোক্ষ ইঙ্গিঁত এও হতে পারে যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই দুর্নীতির সূচনা ও প্রসারের চালিকা শক্তি হতে পারে।

দুর্নীতি কী?
চেম্বার্সের টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরী ডিকশনারী অনুসারে করাপ্ট শব্দটির অর্থ হচ্ছে টু মেইক পিউট্রিড অর্থাৎ টু টেইন্ট, টু ডিবেইজ, টু স্পয়েল, টু ডেসট্রয় দি পিউরিটি অব । আবার করাপশন শব্দটির অর্থ করা হয়েছে পচা, ঘুষ, ভেজাল, কৃত্রিম ও নকল হিসাবে। হাল আমলের উইকিপিডিয়া যার অন্য নাম ফ্রি এনসাইক্লোপেডিয়া অনুসারে দর্শন, ধর্মশাস্ত্র অথবা নৈতিকতার আলোকে দুর্নীতি হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয় অথবা অর্থনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। সে প্রেক্ষিতে দুর্নীতিকে অনার্জিত আয় বলা যাবে যা প্রাপ্তিতে আইন ও বিধি স্বীকৃত রোজগারের পন্থা অনুসৃত হয় নি। দুর্নীতিকে অনেকেই ঘুষ, কিকব্যাক অথবা বকশিশের আরেক নাম বলে অভিহিত করে থাকেন। সরকারী কর্মকান্ডের পরিসরে দুর্নীতি সংঘটিত হয় যা যখন এর একটি অঙ্গ অথবা এজেন্ট এমন ধরণের সিদ্ধান্ত নেন যেটি অন্যায়ভাবে আর্থিক সুবিধা আদায় অথবা স্বজনপ্রীতি অথবা রাজনৈতিক প্রচারাভিযানে চাঁদা প্রদানকারীর স্বার্থ আদায়ের পথ খুলে দেয়। বলা বাহুল্য এ ধরণের দুর্নীতিগ্রস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতে ন্যায়নীতি, বিবেক ও সুবিচারের কোন বালাই থাকে না। রাজনৈতিক দুর্নীতি বলতে সাধারণতঃ সরকারী (পাবলিক) ক্ষমতাবলে প্রাপ্ত সম্পদের অপব্যাবহারকে বোঝায় যার পিছনে অবৈধ ব্যক্তিগত লাভক্ষতির বিবেচনা কাজ করে। এ ধরণের দুর্নীতিতে সরকারী কর্মকর্তাগণ জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, ঘুষ ও ভোট কেনাবেচার মাধ্যমে বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী মহলের অনুকূলে সরকারী সিদ্ধান্ত করে দেন। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে একটি লাভের বিনিময়ে পণ্যসেবা হিসাবে বিক্রী করা হয়।

তবে সিস্টেমিক করাপশন অর্থাৎ সর্বগ্রাসী কাঠামোবিস্তৃত দুর্নীতিটাই সবচেয়ে মারাত্মক। প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক দুর্বলতা, পদ্ধতিগত ত্রুটির ফলে সর্ষের মাঝে ভুত অবস্থান এবং নড়বড়ে নেতৃত্বের কারণেই অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারীগণ সিস্টেমেটিক দুর্নীতিতে আখের গোছাতে তৎপর থাকেন। গোষ্ঠিস্বার্থের সংঘাত, বেশী বেশী নিয়মবহির্ভূত অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতা প্রয়োগ, জবাবদিহিতার অভাব, অস্বচ্ছতার বিস্তার, সরকারী চাকুরীর বেতনভাতার দৈন্য এবং ”বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদার” ন্যাক্কারজনক সংস্কৃতি যেথানে প্রবল সেখানে দুর্নীতি বাসা বাধবেই। ছড়িয়ে পড়বে ঘুষ, চাঁদাবাজী ও তহবিল তসরুফের ঘটনার পর ঘটনা। দুর্নীতি পরিণত হবে নিয়মে, সুশাসন হবে বিতাড়িত।

দুর্নীতির প্রকার ও পরিণাম
দুর্নীতির কুফল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। দুর্নীতি একটি বহুমাত্রিক ব্যাধি যেখান থেকে রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অবক্ষয়, পচন শুরু, এমন কি অব্যাহতভাবে তা ধ্বস নামাতে পারে। এর ফলে বিশেষ করে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ট্রান্সপ্যারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতি বিষয়ে একটি আলোচিত প্রতিষ্ঠান। এর মিশন স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, , “Corruption is one of the greatest challenges of the contemporary world. It distorts public policy, leads to misallocation of resources, harms the private sector and the private sector development and particularly hurts the poor.”

বলার অপেক্ষা রাখে না যে দুর্নীতির নেতিবাচক প্রভাব সর্বগ্রাসী। এ যেমন নৈতিকতাকে পদদলিত করে অথবা জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিককে ভেজালে কলুষিত করে তেমনি বিচার, বিবেক ও ন্যায়পরায়ণতাকে বিসর্জন দিয়ে একজন মানুষকে ঘৃণিত জীবনধারণের দিকে ধাবিত করে। দুর্নীতির একটি রূপ হতে পারে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে প্রদত্ত সিদ্ধান্তকে উৎকোচ অথবা অন্য কোন প্রশ্নবিদ্ধ সুবিধা গ্রহণের বিনিময়ে অন্যায়ের অনুকূলে প্রবাহিত করা।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় বড় কেনাকাটায় বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে বড় অংকের কিকব্যাকের মাধ্যমে প্রভাবিত করে বেশী মূল্যে নিম্ন মানের পন্য বা সেবা কিনতে প্রলুব্ধ করার নজির শুধু “লকহিড” কেলেংকারীতে সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতির পঙ্কে ডুবে থাকা কতিপয় দেশীয় এজেন্টকে হাত করে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন হীরা, সোনা, তেল, কাঠ ইত্যাদি অত্যন্ত কম মূল্যে দেশান্তর করার দুর্নীতিগ্রস্ত কেনাবেচা এখনো চলছে। এতে দেশের সম্পদ স্বল্পমূল্যে পাচার হয়ে গেলেও কোন কোন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং/অথবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবানেরা লাভের অঙ্কে স্ফীত হয়ে দেশ বিক্রীর প্রক্রিয়ার ধিকৃত কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়।

বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর দুর্নীতির আরো একটি নিকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে ট্রান্সফার প্রাইসিং এর মাধ্যমে সম্পদ দেশান্তর করা। একটি কোম্পানীর বিভিন্ন দেশে শাখা বা স্থানীয় অফিস থাকতে পারে। একটি দেশ বা স্থানীয় অফিসে ঐ দেশে উৎপাদিত খনিজ বা কাঁচামাল পন্য কোম্পনীটি বাজার মূল্যের চেয়ে বেশী মূল্যে কেনা হয়েছে দেখিয়ে উৎপাদনস্থল দেশান্তর করে উৎপাদন খরচ বেশী দেখিয়ে লাভের পরিমাণ কৃত্রিমভাবে হ্রাস করে দেখাতে পারে। এতে অনার্জিত লাভের অঙ্ক যেমন বেশী হয় তেমনি হ্রাস পায় কর প্রদানের পরিমাণ। জাতিসংঘে গৃহীত কোড অব কন্ডাক্ট ফর মাল্টি ন্যাশনাল কর্পোরেশনসে এ ধরণের ট্রান্সফার প্রাইসিংজনিত দুর্নীতি বিলুপ্ত করা তো দূরের কথা একে তেমন হ্রাসও করতে অক্ষম বলে মনে হয়।
দেশের অভ্যন্তরে বড় মাপের দুর্নীতির একটি হয়ে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠি স্বার্থে আইন প্রণয়ন বা আইন পরিবর্তন। এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে থাকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান অথবা সদস্য তার/ তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পক্ষে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকারী নীতিতে পক্ষপাতিত্ব আনার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হওয়ার। এ ধরণের দুর্নীতি সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপে বন্ধ হয়ে থাকে, যদি না হয় তবে সরকারের প্রতি জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তবে তার চেয়েও বড় কথা, এর ফলে সীমিত সম্পদের জন্য অসীম চাহিদাকে গোষ্ঠি/ব্যক্তিস্বার্থ ভিত্তিক বিকৃতির মাধ্যমে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করা হতে পারে এবং হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য ও অপ্রতুল সরবরাহের সম্পদ জমি দখলের পেশী শক্তির অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সরকারের কোন কোন সময়ের উদাসীনতাকে দুর্নীতির প্রশ্রয় দেয়া বলে অনেকে ভাবতে পারেন। টেন্ডার ও ছিনতাই যদি রাজনৈতিক শক্তির চোখ বুজে থাকা অর্থাৎ প্রশ্রয়ে হয়ে থাকে এবং এতে যদি সরকার ও বিরোধী দলের সমর্থিত অঙ্গ সংগঠনগুলো একতাবদ্ধ হয়ে অংশ ভাগাভাগিতে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে এ দুর্নীতি রোধের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

সাধারণতঃ সরকারী কর্মকর্তদের উৎকোচের বিনিময়ে আটকে রাখা নথি চালুকরণ অথবা নথি হারিয়ে ফেলা অথবা নথিতে ঘুষ প্রদানকারীর পক্ষে সুপারিশ করা ধরণের দুর্নীতি খুবই প্রাধান্য দিয়ে আলোচিত ও প্রকাশিত হয়। এ সকল ক্ষেত্রে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চলমান প্রক্রিয়ায় অপ্রতুল বেতনবৃদ্ধি এমনকি স্থবির বেতনের হ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতায় দিশেহারা কেউ কেউ যদি স্বল্প পরিমাণে অবৈধ উপার্জনে লিপ্ত হয় তবে তাকে ফলাও না করে সমস্যা সমাধানের দিকে মনযোগ দেওয়া উচিৎ হবে। এই সকল ছোট দুর্নীতির বিষয়ে প্রচুর শোরগোল থাকলেও নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহী বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি বিশেষের বড় অঙ্কের চাঁদার বিষয়টি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যায়। ব্যক্তি মালিকানাধীন তথ্য মাধ্যমগুলো এ বিষয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করে না। ভাবখানা এই যে, সব রাজনৈতিক দলই যেহেতু তাদের রাজনৈতিক খরচ মেটানোর জন্য এ ধরনের আর্থিক অনুদান গ্রহণ করে থাকে এবং একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেহেতু বিবদমান সকল দলকেই কমবেশী আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে ভবিষ্যতে ক্ষমতাবান হলে নানা ধরণের সুবিধা ও আনুকূল্য পাবার আশায়, সে জন্য এ ধরণের প্রচারাভিযানে অর্থ প্রদানে তেমন দোষের কিছু নেই। নিশ্চয়ই সমাজ, রাষ্ট্র, ন্যায়নীতি ও স্বচ্ছতার নিরিখে এ ধরণের আর্থিক লেনদেন শুধু দুর্নীতি নয় বরং দূর্নীতির সুতিকাগার হিসাবে দানা বাঁধতে পারে।

দুর্নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা
একটি স্বধীন দেশের সার্বভৌমত্ব ও সার্বিক নিরাপত্তা বড় ধরণের ষড়যন্ত্রের কারণে হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। আর যদি দেশের অভ্যন্তরে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সে ষড়যন্ত্রকে সহায়তা প্রদান করে তবে এর চেয়েও বড় নিকৃষ্টতম দুর্নীতি আর কী হতে পারে। বলা হয়ে থাকে যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর জনগণ। তবে এ বিপুল জনগোষ্ঠীকে জনশক্তি তথা মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট বরাদ্দ ও সদ্ব্যাবহার করে অন্যান্য খাতের সহযোগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থপূর্ণ ও যথাসম্ভব বেশী বেশী বিনিয়োগ করা দরকার। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই অগ্রাধিকারের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বরাদ্দ কমানো হয় অথবা বরাদ্দকৃত অর্থসম্পদের অপচয় বা লুটপাট করে মানবসম্পদ সৃষ্টির কাজে বাঁধা সৃষ্টি করা হয় তাহলে সে দুর্নীতি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। অবশ্য রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য শত্রুমহলে পাচার এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় তথ্য বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার অপকর্ম একদিকে যেমন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে বিবেচিত হয় অন্যদিকে তেমনি তা সবচেয়ে নিকৃষ্ট দুর্নীতি বলেও ঘৃণিত হতে পারে।

সরকারের বাইরে দুর্নীতি
বাজারধর্মী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিসরে বিরাজমান ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ হয়ে থাকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বৃহত্তর চালিকাশক্তি। গণখাত ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো সৃষ্টি করে যার ছায়াতলে ব্যক্তিখাত যোগ্যতা, দক্ষতা, ক্ষিপ্রতা, গতিময়তা ও উদ্ভাবনী পরিশ্রমে সমৃদ্ধির অগ্রগতি সৃষ্টি করে; সুতরাং উভয়খাতের পারস্পরিক পরিপূরক শক্তিই কেবল পারে সীমিত সম্পদের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশকে সমৃদ্ধির সোপানে দ্রুতবেগে এগিয়ে নিতে। সে ক্ষেত্রে একখাতের দক্ষতা যেমন অন্য খাতকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে তেমনি একের অযোগ্যতা ও দুর্নীতিও অন্যকে নেতিবাচকভাবে পিছুটানে আক্রান্ত করতে পারে। দুই খাতের মধ্যকার লেনদেনে দুর্নীতি বিরল নয়। তবে ব্যক্তিখাত এর “প্রতিবন্ধকতাকে” ঘুষ ও অন্যান্য রকমের উপঢৌকন দিয়ে এর রাস্তাকে সুগম করে। এটা দৃষ্টান্ত হয়ে গণকর্মীদের কাউকে কাউকে দুর্নীতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে সরকারের বাইরে বা ব্যক্তিখাতের বৃহৎ মাপের দুনীতি হল আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং তার চেয়েও বড় কথা, দেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অংশবিশেষ বিদেশে পাচার করা। যেমন রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যয় করে ব্যাপক পলিসি সমর্থন তথা শতকরা সত্তর ভাগ ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে বিনা শুল্কে আমদানি করতে দিয়ে তৈরী পোষাক ও নিটওয়্যারের রপ্তানীর রাস্তা সুগম করা হলেও ঐ খাতের এক শ্রেণীর রপ্তানীকারক রপ্তানী মুল্যের একটি অংশ বিদেশে জমিয়ে রেখে বাড়ী, গাড়ী ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন যার কোন উপকার দেশবাসী ভোগ করেন না। উপরে বর্ণিত বড় ধরণের দুর্নীতি এবং কালোবাজারী, মানিলন্ডারিং জাতীয় অপরাধ অর্থনীতির জীবনীশক্তিকে কুরে কুরে খায়। সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বিনিয়োগের প্রয়োজনের তুলনায় সঞ্চয়ের পরিমাণ কম হওয়ার বাঁধাটি প্রবল হয়ে থাকে। বাংলাদেশে হালে জিডিপির হিসাবে শতকরা উনত্রিশ ভাগ সঞ্চয়ের বিপরীতে বিনিয়োগ হয় শতকরা পঁচিশ ভাগের কিছু কম। অর্থনীতির ব্যাকরণে এটা ঘটতে পারে না। আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং, রপ্তানীখাতের কিছু অংশ বিদেশে রেখে দেয়া, মানি লন্ডারিং ও স্মাগলিং ধরণের মারাত্মক দুর্নীতি এই অদ্ভুত সূত্রবহির্ভূত ঘটনার জন্য দায়ী বটে। ব্যক্তিখাতে ট্রেডইউনিয়নের দৌরাত্ম ও দুর্নীতির সম্পর্কে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ১৯৯৯ সনে একটি টাস্কফোর্সের সমীক্ষায় বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এনজিও খাতের দুর্নীতি, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাবসহ বহিঃনিরীক্ষক মাধ্যমে হিসাব নিকাশ পরীক্ষা করানোর অনীহার বিষয়গুলো বহুল আলোচিত। ২০০৫ সনে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা বাংলাদেশের এনজিও খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিরোধ ও নির্মূলের উপায় কী?
দুর্নীতি বিষয়ক যে কোন আলোচনায় এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাজনৈতিক শক্তির মহল বিশেষের অংশগ্রহণ নিদেনপক্ষে নিরব সম্মতি ছাড়া দুর্নীতির বিষবাস্প দীর্ঘদিন চলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে এ উপলব্ধিও সত্য যে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর। তাহলে এ প্রশ্ন উঠতেই পারে যে রাজনৈতিক কৃতসংকল্পতা ছাড়া কি দুনীতি প্রতিরোধ বা দুর্নীতি দমন আদৌ সম্ভব। দুর্নীতি বিপুলভাবে লাভজনক, সংক্রামক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে হলেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার ক্ষেত্রে অর্থের যোগানদার। দুর্নীতি প্রতিরোধ অথবা দমনে রাজনৈতিক কৃতসংকল্প ও কার্যকর পদক্ষেপসমূহ শুরু ও জারী রাখতে হলে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থনীতি ও রাজনীতির চলার পথের মোটা দাগীয় যে ক্ষেত্রসমূহের জাতীয় ঐক্য অতি অবশ্য প্রয়োজন দুর্নীতি তার অন্যতম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৮ সনের সাধারণ নির্বাচনের ইশতেহার পূর্ব “দিন বদলের সনদের” উপধারায় স্স্পুষ্ট অঙ্গীঁকার ঘোষণা করেছে, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাঃ দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, কালোটাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতি দফতরে গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে। সরকারী কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে কম্পিউটারাইজেশন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।”

অনুরূপভাবে বিএনপিও ইহার নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের বিষয়ে দৃঢ় মনোভাব বিবৃত করেছে এবং ২০০২ সনে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন স্থাপনের কথা উল্লেখ করেছে। ২০০৯ সনে পুনর্গঠিত ও নতুন করে ক্ষমতায়িত দুর্নীতি দমন কমিশন আগের যে কোন সময়ের তুলনায় শক্তিধর হলেও আইনি ক্ষমতা, জনশক্তি ও প্রক্রিয়াজাত জটিলতা একে “দন্তবিহীন বাঘে”পরিণত করেছে কিনা সে বিতর্কও মাঝে মধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এ কথা অবশ্য নিঃসন্দেহে বলা যাবে যে, সরকারী কর্মকর্তাগণের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা শুরু করতে কর্তৃপক্ষীয় পুর্ব অনুমোদনের ব্যবস্থা রহিত করা একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতি দমনে সরকারের এই সদিচ্ছা পূর্ণতর রূপ নিতে পারে যদি সংবিধানের ৭৭ অনুচেছদে বিবৃত ধারা অনুসারে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। স্মর্তব্য যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সকলকে আয় ও সম্পদ করের আওতায় আনার সিদ্ধান্তটি দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এর আশু বাস্তবায়ন কাম্য। দুর্নীতি দমন কমিশনকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টির পক্ষে যেমন বলার আছে তেমনি বিপক্ষেও। বাকী থাকলো সরকারী ও বিরোধী দলীয় সকল নেতৃস্থানীয়গণের আয়কর প্রদান বাধ্যতামূলক করা এবং সম্পদ বিবরণী জমা নেওয়া।

বাংলাদেশের দুর্নীতি ও বহিঃশক্তির প্রভাব
বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রসারে বিদেশী সংশ্লিষ্টতা বিদ্যমান রয়েছে। দেশে যদি বছরে গড়ে দেড়শত কোটি মার্কিন ডলারের সমমূল্যে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহ ও তৎসংশ্লিষ্ট কেনা কাটা হয় তাহলে দেশীয় দুর্নীতির ধারার সাথে বিদেশে চলমান দুর্নীতির অপশক্তি আমদানি হয়ে তা সংযুক্ত হতে বাধ্য। সে প্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করেন যে বিদেশের অনুরূপ কিছু সম্পূরক আইনী বিধান বাংলাদেশে চালু করা উচিৎ। যেমন ”The Foreign Corrupt Practices Act (FCPA) of 1977” আইনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি সময়ে পাশ করা হয় যখন লকহীডের ২২ মিলিয়ন ডলারের কিকব্যকসহ ৪০০টি বড় কোম্পানী সারা বিশ্বে দুর্নীতির ব্যাধি ছড়িয়ে দিতে থাকে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে উন্নয়নশীল দেশসমূহের দুর্নীতি বিস্তারে অথনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী বিশ্বের দেশসমূহের নাটের গুরুদের অবদান থাকলেও এটা দমনে ঐ সকল দেশ বা প্রতিষ্ঠান এক ধরণের উদাসীন অবহেলা প্রদর্শন করে থাকে। ২০০৭ সনের ২রা নভেম্বর তারিখে ব্র্যাকে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল সভাপতি ডঃ হুগেট লাবেলকে বাংলাদেশের ২০০৩-০৪ সনে অনুষ্ঠিত দুটো খুব বড় দুর্নীতি ঘটনার বিচারে উন্নত বিশ্বের ব্যাংকিং খাত ও তথ্য মিডিয়া কেন অবদান রাখছে না তা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। বরং স্থানীয় বিষয় স্থানীয়ভাবে মিটানোর উপদেশ খয়রাত করেন।

সুশীল সমাজ ও তথ্য মাধ্যম
বিকাশমান ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনী কাঠামো, সংস্কৃতি ও রীতি নীতির শেকড় গড়ে উঠতে সময় লাগে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সংগ্রামে গণতান্ত্রিক সরকার প্রত্যক্ষ দুর্নীতি দমনে তৎপর হলেও প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডে ছাড় দিতে একধরণের বাধ্য বাধ্যবাধকতায় জড়িয়ে পড়তে পারে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও জাতীয় ঐক্যের অভাব ও নির্বাচনী প্রচারে এমনকি রাজনৈতিক দল চালানোর জন্য অর্থ সংগ্রহের বিশ্বব্যাপী প্রথা চালু থাকার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমনে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই দেশে দেশে নিরপেক্ষ, শক্তিশালী ও দক্ষ বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হতে পারে। এ সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ বর্তমান নিবন্ধে নাই।

তথ্য মাধ্যমকে গণতন্ত্রের পঞ্চম স্তম্ভ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। অবশ্যই এটার শক্তি বিশাল। তবে গণমাধ্যমকে যদি কুশাসন ও দুর্নীতি অনাচারের বিরুদ্ধে ধারালো অস্ত্র হিসাবে দাঁড়াতে হয় তাহলে একে সম্পূর্ণভাবে একটি নিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। সত্তরের দশকে মাত্র দু’জন সাংবাদিক অসীম সাহস ও যোগ্যতায় মহাশক্তিধর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ইমপিচমেন্টের দ্বারপ্রান্তে এনে পদত্যাগে বাধ্য করিয়ে যে নজির স্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশে এর পুনরাবৃত্তি আশা করা মুশকিল হবে বৈকি। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসার দুই দশকে দেশের তথ্য মাধ্যমের নেতৃবৃন্দকে দু’বারের বেশী ঐক্যবদ্ধ হতে দেখা যায়নি। অন্ততঃ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাওয়াকে বোধহয় আমাদের মিডিয়ার বন্ধুগণ গণতান্ত্রিক কর্তব্য হিসাবে গণ্য করেন। ১৯৯৯ সনে বেসরকারী খাতে একুশে টিভি স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য মাধ্যমে নিরপেক্ষতা স্থাপনের যে সাহসী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল ২০০২ সনের আগস্ট মাসে একুশে টিভি বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে কার্যকর ভাবেই দুই শিবিরে ভাগ করে দেয়ার পথ সুগম করে।

দেশের দুর্নীতির আগাম খবর প্রকাশ করে গণমাধ্যম দুর্নীতি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে নিঃসন্দেহে। তবে ঐক্যবদ্ধ মিডিয়ার কন্ঠ যত বলিষ্ঠ হতে পারত, বাংলাদেশে কেন জানি মনে হয় তেমনটি হচ্ছে না। আর ঘটে যাওয়া দুর্নীতির খবরের যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় কম বেশী গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ ঘটে। আর এহেন খন্ডচিত্রের দুর্নীতির পক্ষপাতিত্বমূলক সংবাদের উপর ভিত্তি করেই ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ধারনাসূচক দিয়ে বাংলাদেশকে সর্বনিকৃষ্ট দুর্নীতিবাজ দেশ হিসাবে বহিঃর্বিশ্বে পরিচিত করে। দেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি চিত্রনে জেনে হোক বা অজান্তে হোক একটা ভূমিকা রাখে। বিভক্ত মিডিয়া শিবিরে রাজনৈতিক সহমর্মিতার কারণে দুর্নীতির খবর চেপে যাওয়া অথবা বৈরী পক্ষে (ক্ষুদ্র) তিল পরিমান দুর্নীতিকে (বিশাল) তাল পরিমাণ দুর্নীতি হিসাবে চিত্রিত করার নজির যথেষ্ট আছে।

দুর্নীতি দমনে সুশীল সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করার আগে সুশীল সমাজ বলতে আমি কী বুঝি বা সাধারণভাবে কী বোঝানো হয় সে সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। সুশীল সমাজ বলতে অনেকেই একটি রাজনীতি নিরপেক্ষ সচেতন দেশের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ সোচ্চার গোষ্ঠিকে বোঝায় যেটি বা যারা ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য ব্যাখ্যা করে দুর্নীতিসহ সকল ধরণের অন্যায়ের অহিংস প্রতিবাদ করে। এহেন একটি শক্তি নির্মোহ নির্লিপ্ততায় সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ও সমাজের কর্মকান্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায় অবিচার অনাচার দুর্নীতি সন্ত্রাস বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ালে একটি দুর্লঙ্ঘ শক্তির প্রাচির তৈরী করতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ধরণের একটি সংগঠিত শক্তি কি কেবল ভলান্টারী শ্রম ও সময় দিয়ে তৈরি হতে পারে। আর যদি এর পেছনে শ্রম ও অর্থ সম্পদ খরচ করতে হয় তবে এর যোগানদাতাদের এজেন্ডার ঊর্ধে উঠে সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠান কি বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ নির্লিপ্ত সাহসিকতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে অব্যাহত ও দুর্বার প্রতিরোধ / প্রতিবাদ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে! উত্তর যে ইতিবাচক হতে পারে তার প্রমাণ সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন বিশেষ করে এর প্রাণপুরুষ ডঃ বদিউল আলম মজুমদারের জিহাদসম আইনী লড়াই যার মাধ্যমে আজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদসহ পাবলিক অফিসে নির্বাচন প্রার্থীগণকে নির্বাচনে প্রার্থী হবার সময়ই নিজ ও প্রতিষ্ঠান এবং আত্মীয় স্বজন সম্পর্কে আর্থিক, ফৌজদারীক এবং অনুরূপ তথ্যাদি প্রকাশে বাধ্য থাকা। আবার এ সুজনেরই আরেকটি দুঃখজনক বৈপরীত্য দেখা গেল যে ২০০৮ সনের নির্বাচন যেন জরুরী আইনের অধীনে হয় তার জন্য প্রাণপাত চেষ্টা করার মধ্য দিয়ে। সুজনকে অবাস্তব হতে দেখা গেল ব্যালটে না সূচক সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক বিধান রাখার আন্দোলন করতে।

২০০৮ সনের সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুজনসহ দেশে বিদেশে প্রশংসিত নির্বাচনে একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভোটার অংশ নেতিসূচক ভোট দিলেও গণতান্ত্রিক দাবী মেনে নিয়ে সেই দাবী পরিত্যাগ করার মানসিকতা সুজন এখনো প্রদর্শন করেনি। সুজনের বাইরেও সুশীল সমাজের বড় অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে। অধিকাংশ সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তার সঙ্গে যদি ঐক্যবদ্ধ তথ্য মাধ্যম সংয্ক্তু হয়ে কৃতসংকল্প লড়াই করে তা হলে যে ইতিবাচক ফল লাভ সম্ভব তার ষোলআনা প্রতিফলন ঘটেছে নারায়নগঞ্জে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। সেখানে তথ্য মিডিয়া ও সুশীল সমাজ ন্যায় ও সত্যের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ দুর্বার অবস্থান নেয়ার ফলে বেগতিক দেখে এক পক্ষ নির্বাচনের আগেই রণেভঙ্গ দেয় এবং অন্য পক্ষ জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত রায়কে মেনে নিয়ে ইতিবাচক ধারার সৃষ্টি করে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দুর্নীতি দমনের অভিযানকে সফল করতে হলে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ ও উদ্যমকে একযোগে কাজে লাগাতে হবে। তবে এ কঠিন লক্ষ্যে সফলতা অর্জনের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে দুর্নীতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। সাধারণভাবে সরকারী প্রচার মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তেমন বেশী নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ ও প্রচারিভযানের কার্যকারিতাও আংশিকভাবে সফল হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যদি সংঘবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে দুর্নীতির কদর্য চেহারাকে পরিচিত করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এবং জনস্বার্থে এর কুফল সম্পর্কে তথা ও যু্ক্তিপূর্ণ ও সুচিন্তিত লেখালেখি করা হয় তা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ অভিযানে দুরন্ত শক্তি যুক্ত হবে। সেই সাথে আইন ও শালিস কেন্দ্র, বেলা, ব্রতী, ডেমোক্র্যাসী ওয়াচ, সুজন, পরিবেশ আন্দোলন ও অন্যান্য অনুরূপ সুশীল সমাজীয় প্রতিষ্ঠান দুনীতি অনাচার ও কুশাসনের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ সমন্বিত আওয়াজ উঠাতে পারলে এই পচনব্যাধিকে ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

দুর্নীতি অবশ্যই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক শ্লথ গতি আনে। এর ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দারিদ্র নিরসনেও দুর্নীতি একটি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবমতে দুর্নীতির ফলে বাংলাদেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শতকরা দু’ভাগ কমতি আসতে পারে। এ সকল কারণে এবং একটি সুস্থ, সবল, প্রবৃদ্ধির জোয়ারে ভেসে থাকা সমৃদ্ধশালী অর্থনীতি ও দারিদ্র নির্মূলে মরণকামড় দেবার স্বার্থেই একটি দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গঠন করা জরুরী। এ জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকারে যেমন কৃতসংকল্পতা অপরিহার্য তেমনি সেই মহৎ উদ্দেশ্য রূপায়নে বিশেষ করে একটি ঐক্যবদ্ধ গণমাধ্যমের জোরদার প্রচেষ্টা ও সুশীল সমাজ অসাধারণ ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

ডঃ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য।

সরকারের সদিচ্ছা ও জনগণের প্রচেষ্টা গুরুত্ববহ।

সরকারের সদিচ্ছা ও জনগণের প্রচেষ্টা গুরুত্ববহ।
মিল্টন বিশ্বাস downloadগত ডিসেম্বরে (২০১৩) ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধে অঙ্গীকার করা হয়েছে এভাবে- ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনি, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরো বাড়ানো হবে। ঘুষ, অনুপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিজেদের সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী অঙ্গীকারে অনুরূপ বক্তব্য ছিল। ২০০৯ সালে গঠিত মহাজোট সরকার সেই অঙ্গীকার পূরণে কতটুকু সফল হয়েছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার। কারণ তারা একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, অনেক আশাবাদ নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। তার আগের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ছিল কলঙ্কিত। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয়/অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতি, দৌরাত্ম্য দেশবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলের পাঁচ বছরই টিআইবির রেটিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। উল্লেখ্য, দেশ পরিচালনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকেই উল্টে দিয়েছিল। নস্যাৎ করে দেয় সব সম্ভাবনা। তারেক রহমানের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল বা বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’। এই হাওয়া ভবন থেকেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও কমিশন সংগ্রহ, প্রশাসনের নিয়োগ-বদলি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা প্রভৃতি দেশবিরোধী অবৈধ কর্মকা-ে অঘোষিত হেড কোয়ার্টার। মহাজোট সরকারের গত পাঁচ বছরে সেই দুর্নাম বহুলাংশে মোচন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যে কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কমেছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে ও রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানই অনন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রামের চালিকাশক্তি ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন। কিন্তু রাষ্ট্রের ৪৩ বছরের ইতিহাসে সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতির পিতার শাহাদাত, সামরিক শাসন এবং স্বৈরাচারী, গণবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ক্ষমতা দখল জনগণের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নকে বারবার দূরে সরিয়ে দিয়েছে। জনগণের জীবনে এ ধরনের শাসনের কুফল প্রতিফলিত হয়েছিল অনুন্নয়নে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবদমনে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনায়, দুর্নীতিতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুদ্ধাচারের অভাবে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার এ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। এ যুদ্ধকে শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার শাসনামলে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘… সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এ অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কিনা সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊধর্ে্ব থেকে আমাদের সবাইকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ শেখ হাসিনাও তার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সব কাজে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রনিষ্ঠার ওপর সর্বশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে আলোকে আইন-কানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইন-কানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। চরিত্রনিষ্ঠা আনয়নের জন্য মানুষের জীবনের একেবারে গোড়া থেকে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতেও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না।’ স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) শেখ হাসিনা সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম যেসব আইন গত মহাজোট সরকারের সময় প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’, ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’, ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’, ‘চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন, ২০১০’, ‘জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১’, ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’, ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’, ‘প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২’ ইত্যাদি। এসব আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি প্রতিরোধের বিধান ব্রিটিশ আমল থেকেই চালু রয়েছে। ১৮৬০ সালের চবহধষ ঈড়ফব-এ দুর্নীতি প্রতিরোধের বিধান আছে। ১৯৪৭ সালে দুর্নীতি দমন আইন পাস হয়। ২০০৪ সালের ৫ নাম্বার আইনে ‘দেশে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি ও অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান ও তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান’ প্রণীত হয়। এ আইনের আওতায় যেসব কার্য অপরাধ বলে বিবেচিত হয় তা হলো : ‘(ক) ঞযব চৎবাবহঃরড়হ ড়ভ ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ অপঃ, ১৯৪৭ (অপঃ ১১ ড়ভ ১৯৪৭)-এর অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধ; (খ) ঞযব চবহধষ ঈড়ফব ১৮৬০ (অপঃ ঢখঠ ড়ভ ১৮৬০)-এর ংবপঃরড়হং ১৬১-১৬৯, ২১৭, ২১৮, ৪০৮, ৪০৯ ধহফ ৪৭৭অ-এর অধীন শাস্তিযোগ্য অপরাধসমূহ;’ এবং এসব অপরাধের সঙ্গে সংযুক্ত সহায়তাকারী ও ষড়যন্ত্রমূলক ও প্রচেষ্টামূলক অপরাধকার্য। পূর্বে উলি্লখিত ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এর আওতাধীন অপরাধও দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এ জন্য সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও নাগরিকগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।

বাংলাদেশ জাতিসংঘেরএর অনুসমর্থনকারী দেশ। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য ‘ফৌজদারি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রতিকার ছাড়াও দুর্নীতির ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ’-কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এ কনভেনশনে। আগামী এক দশকে এ দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা’ হবে, ‘যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত’ হবে। এ লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অবশ্য-কর্তব্য এবং সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য পরাকৌশল। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে নাগরিকরা চরিত্রনিষ্ঠ হয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পায়। দুর্নীতি প্রতিরোধে মানুষকে নৈতিক জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ যেন সে অনুসরণ করে চলে। তার যেন সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদ-, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য থাকে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বা নির্মূলে ব্যক্তি-পর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা খুব দরকার। এ জন্য বিদ্যমান আইন, নিয়মনীতির সঙ্গে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে হবে। সেই অঙ্গীকারকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের সদিচ্ছা ও জনগণের প্রচেষ্টা গুরুত্ববহ।

মিল্টন বিশ্বাস: সাহিত্যিক ও কলাম লেখক। সহযোগী অধ্যাপক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বাংলাদেশের দুর্নীতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে:টিআইবি

বাংলাদেশের দুর্নীতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে:টিআইবি

টিআইবি বলছে দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছেনা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআই আজ দুর্নীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে সেখানে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।

গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নিচের দিক থেকে ১৪তম। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকায় প্রথম স্থানে আছে সোমালিয়া। অন্যদিকে টিআই’র বিবেচনায় সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হচ্ছে ডেনমার্ক।

বাংলাদেশের সাথে একই অবস্থানে আছে গিনি, কেনিয়া, উগান্ডা, লাওস এবং পাপুয়া নিউগিনি। টিআই’র সূচকে দেখা যাচ্ছে গতবার বাংলাদেশ ২৫ পয়েন্ট পেয়েছিল এবং এবারো সেটির কোন পরিবর্তন হয়নি।

টিআইবি’র একজন কর্মকর্তা রিজওয়ানুল আলম জানিয়েছেন বাংলাদেশের দুর্নীতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি আজ ঢাকায় দুর্নীতির ধারনা সূচক ২০১৫ নামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড: ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবি বলছে, কোন একটি দেশের সরকারি খাত কতটুকু দুর্নীতিগ্রস্ত তার ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি করা হয়।

ড: ইফতেখারুজ্জামান

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা , দুর্নীতি দমন কমিশনে স্বাধীনতার অভাব এবং আরো কিছু বিষয় এ প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলেছে।

তিনি বলেন এ বছর ১৬৮টি দেশের উপর চালানো জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।

১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা যে জরিপ করেছে তার ভিত্তিতেই এই ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক।

টিআইবি বলছে দুর্নীতি দু’ভাবে হয়। প্রথমত সরকারী কাজে আর্থিক দুর্নীতি এবং দ্বিতীয়ত ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে সে বিচারে বাংলাদেশ ভালো করেনি বলে ড: ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের জন্য আইন এবং প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সেগুলো ঠিক মতো কাজ করছেনা।

দুর্নীতি ও দুর্নীতির উৎপত্তি

দুর্নীতি ও দুর্নীতির উৎপত্তি

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান :
downloadদুর্নীতি একটি বহুল আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর উন্নয়নশীল অনেক দেশেই এটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শক্তির অপব্যবহার এবং অপরাধের শিকড় হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে বাড়ছে মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। আর এ কারণেই স্বচ্ছতা, আল্লাহভীতি ও জবাবদিহিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে ওঠছে না। সৃষ্টির আদিকাল থেকে দুর্নীতি বন্ধের জন্য নানা কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, কিন্তু কার্যত কোনো কৌশলই ফলপ্রসূ হয়নি। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ আরো বহুবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল অর্জিত হয়নি। তবে কিভাবে সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করা যাবে সেটা এখন বিশ্বব্যাপী একটি জিজ্ঞাসা। এ লক্ষ্যে আলোচ্য প্রবন্ধে দুর্নীতির পরিচয়, উৎপত্তি ও বিস্তার, পরিধি, উৎস, কারণ, দমন করার উপায় ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম কি ধরনের বিধান প্রণয়ন করেছে, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

দুর্নীতির পরিচয় : দুর্নীতি কী? প্রথমেই আমাদেরকে এ বিষয়ে জানার চেষ্টা করতে হবে। দুর্নীতি একটি নেতিবাচক শব্দ। সহজ ভাষায় বুঝি কু-নীতি, কু-রীতি। নীতি বহির্ভূত কর্মকা-। ‘‘সংসদ বাঙ্গালা অভিধান, কলকাতা : সাহিত্য সংসদ, ১৯৮৭, পৃ. ৩৩৯।’’ আরবী ভাষায় একে ফাসাদ বলা হয়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘‘যেসব লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হচ্ছে : তাদেরকে হত্যা করতে হবে কিংবা শূলিবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের নির্বাসিত করা হবে।’’ (আল-কুরআন, ৫ : ৩৩) আরবী জারীমা শব্দকেও এর সমার্থক শব্দ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জারীমা অর্থ অপরাধ, পাপ বা আইন বিরোধী শব্দ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। জারীমা অর্থ অপরাধ, পাপ বা আইন বিরোধী কাজ। এর ইংরেজী প্রতিশব্দ হলো crime, offense তাছাড়া Moral degeneration; a malpractice, a corruption, perversion(বদমায়িশি),wickedness, Improbity, dishonesty(অসততা), a diversion from the true path (সৎ পথ থেকে বিপথে গমন)। ÔÔSamsad Bangali-English Dictionary, Calcatta : Sahitya Samsad, 1988, P. 443.’’ যার বিপরীত হলো  Moral, Morality or relating to the conduct of men; The doctrine or practice of the duties of life. Oxford Dictionary, Edited by Oxford University Press. Oxford Learner’s Favorite Dictionary’ Edited by Prof. Raihan Kawsar & Khairul Alam Monir, Published by Chowdhury & Son’s, Dhaka: Banglabazar, 2006.’’

* * Oxford English Dictionaryতে বলা হয়েছে, Dishonest, illegal behabior, especially of people in authority, elegations of bribery. A. S Hornby, Oxford Advanced Learner’s of Current English, Oxford University Press, 2000, P-201’’

অর্থাৎ ‘‘দুর্নীতি হলো অসততা, অবৈধ আচরণ, বিশেষ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে আসীন ব্যক্তিবর্গের আইন বহির্ভূত আচরণ, ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ইত্যাদি।’’

* দুর্নীতি হলো সমাজে প্রচলিত নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিপন্থী বিশেষ ধরনের অপরাধমূলক আচরণ। ‘‘ড. মুহাম্মদ জাকির হোসাইন, আর্থ সামাজিক সমস্যা সমাধানে আল-হাদীসের অবদান: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৪, পৃ. ৪০৭।’’

* সাধারণত ঘুষ বলপ্রয়োগ, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব খাটিয়ে এবং ব্যক্তি বিশেষকে সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে গণপ্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা অর্জনের নাম দুর্নীতি। ‘‘প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০৭-৪০৮।’’

* রমনাথ শর্মার মতে, In corruption a person willfully neglected his specified duty in order to have an undue advantage.. ‘‘প্রাগুক্ত’’ অর্থাৎ ‘‘অবৈধ সুযোগ-সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলার নাম দুর্নীতি।’’

*World Bank কর্তৃক প্রদত্ত দুর্নীতির সংজ্ঞা হলো : Corruption is the abuse of public power for private benefit. ÔÔVito TanziÕÕ ÒCorruption around the world causes, consequences scope and cures in Governance, corruption & economics performance’’ edited by George T. Abed & Sanjeev Gupta Washington International monetary Fund, 2002, P. 25 অর্থাৎ ‘‘দুর্নীতি হলো ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার।’’

* * Transparency International (TI) Ges Corruption Perception Index (CPI)) প্রতিবেদনে দুর্নীতি বলতে সরকারি ক্ষমতা ও সুবিধাকে বেসরকারি বা ব্যক্তিস্বার্থে অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের দুর্নীতিকে বুঝানো হয়েছে। ‘‘আবদুন নূর, ‘আদর্শ, উন্নয়ন ও দুর্নীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ” তা. বি. পৃ. ১৭-১৮।

* * Transparency International এর সংজ্ঞা হলো: Corruption is the abuse of public office for private gain.. অর্থাৎ “সরকারি দফতরকে ব্যক্তি স্বার্থে কাজে লাগানো, যেখানে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়।” মুহাম্মদ মুহিউদ্দিন, দুর্নীতি ও উন্নয়ন : প্রসঙ্গ বাংলাদেশ, ঢাকা: মাসিক ইতিহাস অন্বেষা, মার্চ-২০০৬, পৃ. ৪৩।

* * M. Johne এর মতে, ‘‘Corruption is missuse of public property, public rank and status for private interest.” Political Conference of corruption Comparative Politics, P.460

দুর্নীতি কেবল সরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সীমিত নয়; বরং সরকারি, বেসরকারি, এনজিও বিভিন্ন পেশা, শ্রেণী, পরিবার, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্বার্থেও হতে পারে। যেমন, একজন  সরকারি কর্মকর্তা অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়ে ব্যক্তিগত কার্যাবলী সম্পন্ন করতে পারেন, যা দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে অথবা সরকারি বাজেটের টাকা দিয়ে টেন্ডার ছাড়াই কোনো কাজ নিজের বা দলীয় লোকদের মাধ্যমে করানো অথবা টেন্ডার দিলেও কাজের মান যথাযথভাবে ঠিক না রেখে কিছু টাকা খরচ করে বাকি টাকা নিজের পকেটস্থ করাও দুর্নীতি হিসেবে গণ্য হবে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি, দুর্নীতি হলো প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, আচার-আচরণ, আইনকানুন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে উদ্ভুত এমন এক পরিস্থিতি যা সঠিকভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যাহত করে। অন্য কথায় দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবৈধ স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বলে।

দুর্নীতির উৎপত্তি ও বিস্তার : সভ্যতার প্রথম থেকেই প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রচলন কমবেশি বিদ্যমান ছিল। সম্ভবত প্রশাসনের উৎপত্তির সাথে সাথেই এর প্রচলন ও বিস্তার ঘটতে থাকে। এটি মানুষের ‘ফিতরাত’ তথা স্বভাবের একটি মন্দ দিক। আসমানী কিতাব তাওরাত (Old Testament) এর বিকৃতি ছিলো ইতিহাস বিখ্যাত একটি জঘন্য দুর্নীতি। “প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮” প্রায় দু’হাজার বছর পূর্বে ভারতীয় রাজতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য (Kautilya) তাঁর প্রখ্যাত অর্থশাস্ত্র (Arthashastra) গ্রন্থে দুর্নীতির বিষয়টি আলোকপাত করেছেন। | ÒVito Tanzi, Corruption around the world” P. 25. প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে দান্তে (উহঃব) ঘোষণা করেন, আইন বহির্ভূত কর্মসম্পাদন কিংবা স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে কাউকে প্রভাবিত করার জন্য ঘুষ-উৎকোচ প্রদানকারীর অবস্থান হলো নরকের সর্বনিম্ন স্তরে। “আবদুন নূর, প্রাগুক্ত পৃ. ১৯” বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়র তাঁর কোনো একটি নাটকে দুর্নীতিকে বিখ্যাত চরিত্রে রূপায়ন করেছেন। “প্রাগুক্ত পৃ. ১৯-২০” আমেরিকার সংবিধানে ঘুষ উৎকোচ এবং প্রতারণামূলক কর্মকা-কে জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যে অপরাধ সম্পাদনের কারণে সেখানকার প্রেসিডেন্ট ইম্পিচম্যান্টের যোগ্য হতে পারেন। ÒNooman John T, Bribes, New Yourk, 1984”, ১৯৮৪” ১৭৭৫ সালে ভারতবর্ষের ইংরেজ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিং মীরজাফরের পতœীকে দেড় লক্ষ টাকা উৎকোচ দেয়ার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদে নবাবের রক্ষণাবেক্ষণকার্যে নিযুক্তি লাভ করেন। অবশ্য এজন্য বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট তাকে গভর্নরের পদ থেকে ইম্পিচ করেন। সিভিল প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য ভারতের গবর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংক ১৮২৮ সালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা যাচাইয়ের জন্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (অঈজ) গ্রহণের নিয়ম প্রচলন করেন। “আবদুর নূর, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬” ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনের অবসানের পর ১৯৫৭ সালে এদেশে দুর্নীতি দমন ব্যুরো গঠন করে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকার প্রধানের অধীনস্থ দফতরে পরিণত হওয়ায় এ ব্যুরো তার কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ফলে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকে এ দেশের প্রায় সকল সরকারের ক্ষেত্রেই কমবেশি দুর্নীতির অভিযোগ উচ্চারিত হয়েছে। প্রশাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ কোনো নতুন ঘটনা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপে বর্তমানে হতাশাব্যঞ্জক চিত্র ফুটে ওঠে। সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতিবছর যে অপচয় হয় তা হচ্ছে ১১,২৫৬ কোটি টাকা। “Transparency International, সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০২” ফলে সকল স্তরে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ চীন ও ভারতের চেয়ে প্রবৃদ্ধি অনেক কমে যাচ্ছে। ২০১১ সালে  GDP বিনিয়োগের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ADB–এর কান্ট্রি ডিরেক্টর তেরেসাখো বলেন, WEF–এর ২০১১-১২ রিপোর্টে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অবকাঠামোর দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে। এর অন্যতম কারণ দুর্নীতি। “দৈনিক আমার দেশ, ২৩ মে- ২০১২”

দুর্নীতির পরিধি : আপাত দৃষ্টিতে দেখা যায়, সারা পৃথিবীকেই দুর্নীতি গ্রাস করে ফেলেছে। কিন্তু নীতি বহির্ভূত সকল প্রকার কাজ-কর্ম, আচার-ব্যবহার ও কথা-বার্তা সবই এর আওতাভূক্ত। যেহেতু আয়-উপার্জন জীবনের বিশাল অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই এ ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে যৌক্তিক কারণেই বড় করে দেখা হয়। দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তৃত একটি পরিভাষা। নীতি হিসেবে আমরা যদি ইসলামকে বেছে নেই তবে দুর্নীতিরও একটি সংজ্ঞা প্রয়োজন। ইসলামের সংজ্ঞা যদি এই হয়, ‘আল্লাহর বিধান ও দীনের সামনে আত্মসমর্পন’ অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা, দ্বারা আল্লাহ সকল বিধানের পরিপূর্ণতা ঘটিয়েছেন সেগুলো মনে প্রাণে মেনে নেয়া। যিনি মেনে নিবেন তার মধ্যে কতগুলো গুণ-বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হবে; যথা : তিনি নীতিবান হবেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সদাতৎপর থাকবেন, তার মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশ পাবে ইত্যাদি। বিপরীত দিকে ইসলামী শরীয়তে অপরাধ (জারীমা) বলেও একটি পরিভাষা রয়েছে। দুর্নীতি একটি অপরাধ। যে সম্পর্কে আল্লাহ হদ্দ (বিধিবদ্ধ শাস্তি) অথবা তাজীর (দ-বিধি) দ্বারা হুমকি প্রদান করেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিশাপ এবং পরকালে জাহান্নামের শাস্তির হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।” ড. মোহাম্মদ মোস্তাফা কামাল, মৌলিক সমস্যা সমাধানে ইসলামী আইন, গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক ফাউ-েশন বাংলাদেশ, জানুয়ারী-২০০৬।

মানুষের ইচ্ছা শক্তির দ্বারা সংঘটিত নৈতিক কর্মসমূহের বিপরীতে দুনিয়া ও পরকালে পুরস্কৃত করা হবে এবং অনৈতিক বা পাপাচারের পরিণামে শাস্তি প্রদান করা হবে। মানুষের ইচ্ছা শক্তি হচ্ছে বিনিময়ের মাপকাঠি। ইচ্ছাশক্তি যখন অপরাধ কাজের অবয়বে প্রকাশিত হয়, তখন সেটাই দুর্নীতি এবং সেটাই দ-যোগ্য। এ অপরাধ মানুষের মধ্যে মন্দ চর্চার দ্বারা বিকশিত হয়। মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা চারটি প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। তা হলো- প্রভুত্বের গুণাবলী, শয়তানী গুণাবলী, পশুত্বের গুণাবলী ও হিংস্রতার গুণাবলী। ‘‘প্রাগুক্ত’’ প্রভুত্বের গুণাবলী দুশ্চরিত্রের উন্মেষ ঘটায়। যেমন : অহংকার, গর্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রশংসা ও গৌরবের মোহ, বিরোধিতা ও চিরস্থায়িত্বের মোহ, সবার উপরে বড়ত্বের অনুসন্ধান ইত্যাদি। এগুলো মানব চরিত্র বিধ্বংসী গুণ। এগুলোই দুর্নীতির জন্ম দেয়। শয়তানী গুণাবলী থেকেও অংসখ্য শাখা-প্রশাখা জন্মে। পক্ষান্তরে এ দু’জন যদি বিকৃত স্বভাব ও কুরুচিপূর্ণ মনের অধিকারী হন এবং আধুনিক ও প্রগতিবাদী সাজার অভিপ্রায় নিয়ে উচ্ছৃংখল আচার-আচরণ, কথা-বার্তা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিসরে চালু করেন, তবে তাদের পরিবারটি নৈতিকতা বিবর্জিত হবে এটাই স্বাভাবিক। সেখানে শ্রদ্ধাবোধ, লজ্জা-শরম, স্নেহ-মমতা ও ভালবাসার পরিবর্তে বেয়াদবি, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও উচ্ছৃংখলতা ব্যাপকহারে চালু হবে। আমাদের সমাজে উচ্ছৃংখল কিছু মাতা-পিতা এমনও রয়েছেন যে, নিজেদের কোমলমতি ও নিষ্পাপ ছেলে-মেয়েদের নিয়ে একই সাথে দেশী-বিদেশী টিভি পর্দায় নর্তক-নর্তকীদের উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ নাচ, অশ্লীল অঙ্গভক্তি ও বিকৃত যৌনাচারমূলক দৃশ্য তৃপ্তি সহকারে উপভোগ করেন। একটি শিশু দুশ্চরিত্র হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যতগুলো উপকরণ প্রয়োজন সবগুলোর যোগান এ পিতা-মাতাই দিয়ে থাকে। আবাদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, রসূলুল্লাহ স. বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ। বর্ণনাকারী বলেন, নবী করীম স. অশ্লীলভাষীও ছিলেন না এবং অশ্লীলতার ভানও করতেন না।’’ ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, অধ্যায় : আল-বিরর ওয়াস সিলাহ, অনুচ্ছেদ : মা জাআ ফিল কুহশ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৫০। নবী করীম স. বলেন, ‘‘প্রত্যেক সন্তানই ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অত:পর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বা খৃস্টান বানায় অথবা অগ্নি-উপাসক বানায়।’’ ইমাম তিরমিযী, আস-সুনান, অধ্যায় : আল-কাদার, অনুচ্ছেদ : মা জাআ কুল্লু মাওলুদিন আলাল-ফিতরাহ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৬৬।

পিতামাতাই যদি নিজ হাতে নিজের সন্তানদেরকে ধ্বংসের পথে তুলে দেন তবে সে সমস্ত পিতা-মাতাকে মূলত : দেশ ও জাতির শত্রু বলেই আখ্যায়িত করা যায়। কারণ অপরিণামদর্শী এসব পিতা-মাতাই জাতীয় দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, গডফাদার, আন্তর্জাতিক চোরাচালানি, চোর-ডাকাত বানাবার সবগুলো উপাদান চেতন বা অবচেতনে পারিবারিক পরিবেশে ছোট কচি মনের শিশুটির জন্য প্রধান যোগানদাতার ভূমিকা পালন করেন। তাই সকল পিতামাতার উচিত নিজের প্রাণপ্রিয় শিশুটিকে সৎ, আল্লাহভীরু ও ইসলামী অনুশাসনের পূর্ণ অনুসারী হিসেবে গড়ে তোলার নিমিত্তে পারিবারিক পরিবেশে আল্লাহ প্রদত্ত ও রসূলুল্লাহ স. প্রদর্শিত পন্থায় সুস্থ বিনোদন ব্যবস্থা চালু করা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : পরিবারের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো একটি শিশুর জীবন গড়ার দ্বিতীয় প্রধান পাঠশালা। এ পাঠশালার পাঠ্য তালিকাও একটি শিশুর জীবনের ভীত রচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে জাতিসত্তা ও সভ্যতার অবকাঠামো। জাতীয় চরিত্র গঠন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও বিভাগে নেতৃত্বদানের উপযোগী সৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অবাধ ভোগবাদী সিলেবাস চালু আছে, যা আলোকিত লোক তৈরিতে সম্পূর্ণ অক্ষম। সাম্প্রতিককালে লক্ষ্য করা যায়, দুর্নীতিবাজদের একটা বিরাট অংশ বর্তমান প্রচলিত শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত। যারা কলমের খোঁচায় ও ফাইল আটকিয়ে রেখে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, অথচ এ শিক্ষাকেই বলা হয় ‘শিক্ষাই আলো’। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এ সমস্ত উচ্চশিক্ষিত লোক কেন আজ অন্ধকার জগতের বাসিন্দা? প্রকৃতপক্ষে উচ্চশিক্ষিত হওয়া আর সৎ লোক হওয়া এক কথা নয়। সৎ ও আধুনিক যোগ্য লোক গঠনের জন্য অবশ্যই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। কোনো বিষয়ে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি অপরাধের প্রতি ঘৃণা এবং অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার মনোভাব সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন, তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান ও মূখ্য ভূমিকা রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে।

আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে মানুষ গড়ার কারিগর মুহাম্মদ স. দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত একটি সমাজকে উদ্ধারের নিমিত্তে কী ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন তা লক্ষণীয়। সে শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাস ছিল আল-কুরআন ও আল-হাদীস। এ শিক্ষা গ্রহণ করে গড়ে উঠেছিলেন আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রা.-এর মতো মানবেতিহাস খ্যাত শাসক ও মনীষী। এ ব্যবস্থা আত্মস্থ করে এমন একদল মানুষ তৈরি হলেন, যারা অপরাধের পর বিবেকের কশাঘাতে টিকতে না পেরে নিজেদের অপরাধের বিচার প্রার্থনার জন্য রসূলের বিচারালয়ে হাজির হতেন। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে অভুক্তকে নিজের খাদ্য বিলিয়ে দেয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠলো। এতে এমন এক দল চরিত্রবান নেতৃত্ব গড়ে ওঠলো, যারা এক সময় মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর জন্য হুমকি ছিলো, পরবর্তীতে তাদের পরিচালিত রাষ্ট্রে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রাতে-দিনে সুন্দরী, মূল্যবান সব অলঙ্কার পরিহিতা মহিলা একাকি পথ চলেছে কিন্তু কেউ তাকে জিজ্ঞাসাও করেনি, কেউ তার দিকে চোখ তুলে দৃষ্টিপাতও করেনি। প্রত্যেকটি মানুষ পরস্পরের জান-মাল, ইজ্জত-আব্রুর বিশ্বস্ত আমানতদার বনে গেল। আল-কুরআন এমন সোনার মানুষ তৈরি করল যে, অর্ধেকটা পৃথিবীর বাদশাহী হাতের মুঠোয় পেয়েও দায়িত্বের ভার তাকে এমনভাবে তাড়া করে ফিরতো যে, আরামের ঘুম দূরে ঠেলে দিয়ে রাতের আঁধারে বেরিয়ে পড়তো অভুক্ত মানুষের সন্ধানে। কোথাও কি অসহায় মানবতা জুলুমের শিকার হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ফরিয়াদ করছে? কেউ কি তাঁর শাসন কাজে অসন্তুষ্ট? এ সমস্ত প্রশ্ন তাকে সদা অস্থির করে তুললো। প্রয়োজন পূরণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দু’টি কাপড় নয় বরং অন্যান্য নাগরিকদের ন্যায় একটিই গ্রহণ করলো। কিন্তু এক টুকরা কাপড় দিয়ে তার জামা হওয়ার কথা নয়; ছেলের ভাগের কাপড় দিয়ে নিজের জামা তৈরি করে নিল।

সুতরাং দুর্নীতির সব ব্যবস্থা উন্মুক্ত রেখে দুর্নীতি দমন অসম্ভব। এ জন্য রসূল স.-এর পন্থায় আলোকিত মানুষ তৈরির জন্য আমাদের সেই কুরআন-যা আজো অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে আমাদের সকল কাজের মূলনীতিরূপে গ্রহণ করতে হবে।

প্রচার মাধ্যম : দেশের প্রচার মাধ্যমগুলো দুর্নীতি উচ্ছেদে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকার মিডিয়াগুলোকে নৈতিকতাসম্পন্ন অনুষ্ঠান প্রচারের জন্য বাধ্য করতে পারে। এতে মিডিয়ার স্বাধীনতা ক্ষুণœ হবে না। কারণ দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য এ ধরনের বাধ্যবাধকতা কারো স্বাধীনতাকে ক্ষুণœ করে না। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ মিডিয়া এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দখলে যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না। যারা অবাধ স্বাধীনতার নাম করে কখনো কখনো সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করতে কসুর করে না। অনেক সময় মনে হয়, এদের কাছে সরকার অসহায়। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। কিছুসংখ্যক মিডিয়া আজ ভয়ঙ্কর স্বেচ্ছাচারিতার রূপ ধারণ করেছে। কখনো কখনো দেশের মানুষের চরিত্র হননের সাথে সাথে সমাজ ভাঙনে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। তারা তারা এমনসব তথ্য প্রচার করে, যা আণবিক বোমার চেয়েও অধিক ক্ষতিকর। বোমা একটা নির্দিষ্ট আওতায় কিছু লোকের জান-মালের ক্ষতি করে থাকে কিন্তু একটি বিকৃত মিথ্যা তথ্য সমাজ ভাঙ্গনের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে থাকে। ইথারে ভেসে ভেসে তার আওতার বিস্তৃতি ঘটায়। সমাজকে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করায়। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয় হিংসা-হানাহানি, বিদ্বেষ আর অমানবিকতা। ফলে মানুষ চরম দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হয়। সুতরাং সরকারের দায়িত্ব এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রচারমাধ্যমকে নৈতিকতা বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বাধ্য করা।

দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়

দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব নয়

ইফতেখারুজ্জামান |
downloadদুর্নীতি বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় সমস্যা। দেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সুশাসন ও সার্বিকভাবে ইতিবাচক সমাজ পরিবর্তনের পথে দুর্নীতি এক কঠোর প্রতিবন্ধক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্য গবেষণা অনুযায়ী কার্যকর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশের বেশি হতে পারত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে যোগসাজশের দুর্নীতি রানা প্লাজাকে গ্রাস করেছিল, তার ফলেই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক কর্মী বাহিনীর প্রায় এক হাজার ২০০ তাজা প্রাণকে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করতে হয়।

দুর্নীতির ক্ষতিকর প্রভাব ও এর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অপরিহার্যতার স্বীকৃতি পাওয়া যায় রাজনৈতিক ও সরকারি প্রতিশ্রুতিতে। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার, সরকারের বাৎসরিক বাজেট বক্তৃতা, বাৎসরিক উন্নয়ন কর্মসূচি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি ভিশন ২০১০-২১ ও জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের মতো গুরুত্বপূর্ণ দলিলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের গুরুত্বের স্বীকৃতির পাশাপাশি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ থাকে।

তবে সমস্যা হয়, যখন এসবেরই সমর্থনে ও সহায়ক ভূমিকার প্রয়াসে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে দুর্নীতিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন বা প্রকাশ করা হয়। সরকার ও রাজনৈতিক মহলসহ ক্ষমতাবানদের একাংশ একধরনের অস্বীকৃতির মানসিকতা, সমালোচনা সইবার সৎ-সাহসের ঘাটতি, সমালোচক মাত্রই শত্রু, সমালোচক কখনো শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে না এরূপ ভাবধারায় আবদ্ধ থেকে বার্তাবাহককে স্তব্ধ করার প্রক্রিয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়েন।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে টিআইবি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রভাবশালী এক মন্ত্রী টিআইবি বন্ধ করে দিতে হবে, দেশের ৬৪টি জেলায় টিআইবির বিরুদ্ধে মামলা করা হবে—এ ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন। তৎকালীন এক সাংসদ বলেছিলেন, সময় হয়েছে টিআইবির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার। আমরা হতবাক হয়েছি। ভয়ে নয়, ক্ষোভেও নয়—কেবল হতাশায়। কারণ, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে আমরা আশা করতে পারিনি যে টিআইবি নয়, বরং তাঁরাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলবেন। যেমন ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের এক ভাষণে এই বলে যে একাত্তরের মতো প্রতিটি ঘরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। তাঁর সে প্রত্যয় বাস্তবায়নের আগেই তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

অবশ্য মতৈক্যের এক বিদ্রূপাত্মক বার্তা দিয়েছিলেন গত মহাজোট সরকারের এক সাবেক মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক। টিআইবির আরেক প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় যখন রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত, তখন তিনি এক জনসভায় বলেছিলেন, টিআইবি তো সব সময়ই বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আমরা যখন ক্ষমতায় থাকি, তখন তার প্রতিক্রিয়ায় বলি নাউজুবিল্লাহ; আর যখন বিরোধী দলে থাকি, তখন বলি আলহামদুলিল্লাহ। এর মাধ্যমে একদিকে টিআইবির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া যে অনেক সময় সারবত্তাহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায়; অন্যদিকে প্রতিবেদনের গুরুত্ব, যথার্থতা ও জাতীয় জীবনে এর প্রভাবের ইঙ্গিত মেলে।

টিআইবির বিরুদ্ধে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের হাতে সবচেয়ে সহজলভ্য হাতিয়ার হলো প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের অর্থসূত্র, যা সম্পর্কে অনেকেই জেনেও না জানার ভান করেন। চারদলীয় জোট সরকারের আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী একবার টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এই যুক্তিতে যে টিআইবি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে অথচ নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডকম ও এনরনের অর্থে পরিচালিত হয়। কয়েক দফা তাঁর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে ব্যাখ্যা করে জানানো হয় যে টিআইবি সরকারের নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারের অনুমতি ছাড়া একটি পয়সাও গ্রহণ বা ব্যয় করতে পারে না, করেও না। একই সঙ্গে আরও জানানো হয় যে টিআইবির অর্থসূত্র এমন কয়েকটি দাতা সংস্থা, যারা বাংলাদেশ সরকারেরও উন্নয়ন-সহযোগী। সর্বোপরি, টিআইবি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে না, ওয়ার্ল্ডকম বা এনরন দূরে থাকুক। তিনি ধন্যবাদ জানালেন, বললেন, এ তথ্য তাঁর জন্য সহায়ক হবে। আমরা ভাবলাম, আমরা তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু তার কয়েক দিনের মাথায় তিনিই আবার বললেন, টিআইবি ওয়ার্ল্ডকম ও এনরনের অর্থে পরিচালিত এক প্রতিষ্ঠান।

টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে সংসদে ব্যাপক আলোচনা হয়। মাননীয় সাংসদদের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় হয়। জনগণের অর্থে পরিচালিত গণতন্ত্রের এ সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এরূপ আলোচনা বিরল। তাই আমাদের গর্বই হওয়ার কথা। তবে পাশাপাশি উৎকণ্ঠা আর হতাশা জাগে এ কারণে যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় তা আর যা-ই হোক, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের আধেয় সম্পর্কে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধারণানির্ভর থাকে না। সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একজন সম্মানিত সাংসদ প্রশ্ন তুলেছিলেন, কোন অধিকারে বা কার অনুমতিতে টিআইবি সংসদ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম করে থাকে। তাঁকে সবিনয়ে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছিল যে টিআইবির সব কার্যক্রম কেবল সরকারের অনুমতিক্রমেই পরিচালিত হয়, আর সংসদ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের অনুমোদনে তাঁরই অবদান ছিল।

দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় আমরা ষড়যন্ত্রকারী ও রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যায়িত হয়েছি। সোনালী ব্যাংকের অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থানের কারণে অত্যন্ত প্রভাবশালী এক মন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, ‘তোমরা ষড়যন্ত্র করছ, চার হাজার কোটি টাকা সোনালী ব্যাংকের জন্য কোনো ব্যাপারই না।’ আরেক প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্য এক মন্ত্রী টেলিফোন করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, যার সারমর্ম ছিল, আপনি যা-ই করুন না কেন, বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আনতে পারবেন না। দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননা করেছি, এ অপবাদ শুনতে হয়েছে। তাঁকে শুধু এটুকু বলতে পেরেছি যে আমার চেতনায় যে মুক্তিযুদ্ধ আছে, তাতে রয়েছে একাত্তর। এর সঙ্গে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রভাবিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাংঘর্ষিক বিবেচিত বলে আমার বিন্দুমাত্র ক্ষোভ নেই।

দলীয় বিবেচনায় অন্ধত্বের দৃষ্টান্ত হিসেবে শুনতে হয়েছে এমন কথা: টিআইবি এত সুশাসনের কথা বলে, অথচ পঁচাত্তরে কেন নীরব ছিল। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যার বিরুদ্ধে টিআইবি কেন কোনো কথা বলেনি। বিভিন্ন স্তরের শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি কথাগুলো বলে চলে গেলেন। তাঁকে পরে বলতে হয়েছে, টিআইবির জন্মই হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আর টিআইবির কার্যক্রমের ধারণাগত কাঠামোর অন্যতম উৎস ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ দেওয়া বঙ্গবন্ধুর উপরোল্লিখিত ভাষণ, যেখানে তিনি বলেছিলেন দুর্নীতিবিরোধী আইনের কথা, দুর্নীতিবাজ কাউকে ছাড় না দেওয়ার কথা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার কথা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা, আর বলেছিলেন ছাত্র-তরুণ-বুদ্ধিজীবীসহ সব নাগরিকের সংঘবদ্ধ গণ-আন্দোলনের কথা।

দুর্নীতির প্রতিবেদনের প্রতি নেতিবাচক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধি হয়েছে, আমাদের অনেকের ক্ষেত্রেই মুখে বা প্রকাশ্যে যা বলি, তার সঙ্গে ভেতরে বা অন্তরে যা জানি বা বিশ্বাস করি, তার মিল নেই। অসংখ্য অভিজ্ঞতা হয়েছে যে টিভি টক শোয় পাশাপাশি বসে টিআইবির প্রতিবেদনের জোরালো বিরোধিতা করছেন, প্রত্যাখ্যান করছেন, অথচ বিজ্ঞাপন বিরতিতে বা অন্যভাবে আলাপচারিতায় বলছেন, ‘আপনারা যা বলেছেন, বাস্তব চিত্র তো তার চেয়ে আরও খারাপ, আমরা বলতে পারি না, আপনারা মাথা নত করবেন না, চালিয়ে যান।’ এ ক্ষেত্রে আমাদের মতো বেসরকারি সংস্থার সংগঠনের নেতাদেরও কেউ কেউ পিছিয়ে থাকেন না। টিআইবি যখন বেসরকারি সংগঠন খাতের সুশাসনের ঘাটতির ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করল, তখন এ খাতের সহযোদ্ধাদের বলতে শোনা গেছে, টিআইবি নিজের পায়ে কুড়াল মারল। টিভি টক শোয় প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে অনুষ্ঠান শেষে এমনই একজন বললেন, ‘এনজিওর দুর্নীতির তথ্য আপনার কাছে কতটুকুই বা আছে, আমার কাছে আসবেন, আরও অনেক তথ্য পাবেন।’

এ ধরনের স্ববিরোধিতায় অবাক হই না, তবে অনেক সময় হতাশ হতে হয়। টিআইবির প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় শ্রদ্ধাভাজন মন্ত্রী গণমাধ্যমকে বললেন, টিআইবি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে, মিথ্যাচার করছে, জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। অথচ এ বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি নিজে থেকে ফোন করে বললেন, ‘আপনারা প্রতিবেদন করেছেন, দ্বিমত করার সুযোগ নেই। তবে থাকি প্রচণ্ড চাপে, আমার রয়েছে বাড়তি চাপ… তা সত্ত্বেও চেষ্টা করছি।’ সরকারি কাঠামোর কোনো এক পর্যায় থেকে এমনও বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইনকানুন রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, দুর্নীতিবাজকে শাস্তির উপায় রয়েছে, তাই বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে, ‘মুখোশ উন্মোচন করে দেব,’ এমন হুমকিও শুনতে হয়, যদিও হতবাক করার মতো এরূপ প্রতিক্রিয়ার পর বলা হয়েছে, ‘উচিত হয়নি। প্লিজ, ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ।’

তবে এসবের পরও আশার কথা এই যে উল্লিখিত প্রতিক্রিয়া সংশ্লিষ্ট অংশীজনের একাংশের মাত্র, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক ও সাময়িক। অংশীজনদের মধ্যে, বিশেষ করে সরকার ও রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই রয়েছেন যাঁদের সঙ্গে ও যাঁদের মাধ্যমে টিআইবির সুযোগ হয়েছে রাষ্ট্রকাঠামোয় দুর্নীতি প্রতিরোধক শক্তি বৃদ্ধির জন্য সহায়ক আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুঘটকের ভূমিকা পালন করার।

দুর্নীতি দমন আইনের খসড়া টিআইবি কর্তৃক প্রণীত, যার ভিত্তিতে দুদক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ যে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের সদস্যরাষ্ট্র, তার পেছনে টিআইবি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। তথ্য অধিকার আইন ও তথ্য প্রকাশকারীর সুরক্ষা আইন প্রণয়নে টিআইবি অগ্রণী অবদান রাখতে পেরেছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়নে টিআইবি যেমন সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে, তেমনি এর বাস্তবায়নেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সরকারের সহায়ক শক্তি হিসেবে এগুলো টিআইবির ভূমিকার কতিপয় দৃষ্টান্তমাত্র। এসবের ফলে বাংলাদেশের দুর্নীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না। বরং এ দেশে দুর্নীতি বেড়েই চলেছে। তবে যে সংস্কারগুলো হয়েছে তার প্রয়োগ ও চর্চা নিশ্চিত করতে পারলে কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধ মোটেই অসম্ভব নয়।
ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

দুর্নীতি দেশের প্রবৃদ্ধির তিন শতাংশ খেয়ে ফেলছে

দুর্নীতি দেশের প্রবৃদ্ধির তিন শতাংশ খেয়ে ফেলছে
download-2
নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুশাসন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। দুদক দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল দুর্নীতিই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) প্রায় দুই থেকে তিন শতাংশ খেয়ে ফেলছে।

গতকাল দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন দুদকের মহাপরিচালক ড. মো. শামসুল আরেফিন, ইউএনডিপির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর বেরেসফোর্ড ও প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট মাহমুদা আফরোজ।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, দুর্নীতি নামের ভাইরাস দমনে আমরা অ্যান্টিভাইরাস চাই। এ কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের উত্তম চর্চাগুলো আমাদের দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের প্রায় সব দফতরেই কম-বেশি দুর্নীতি আছে। কিন্তু কমিশনে দুর্নীতি তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা ৩০০ থেকে ৩৫০ জন। প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে এ জনবল দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনের কাজ সত্যিই কঠিন। তা ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তাদের তদন্তের মান নিয়েও আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নই।
ইউএনডিপির প্রতিনিধি দলের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সরাসরি আপনাদের কাছ থেকে আমাদের আর্থিক সাহায্যের তেমন প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন উপকরণ। এসব উপকরণ দেশব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে ব্যবহার করতে চাই। চাই প্রশিক্ষণ। বিশেষ করে
সাইবার ক্রাইম দমন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করা কমিশনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রশিক্ষণে আপনাদের কারিগরি সহযোগিতা কামনা করছি।
সভায় ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর সুদীপ্ত মুখার্জী বলেন, ইউএনডিপি সুশাসনের ওপর অধিকতর গুরুত্ব দেয়। কমিশনের চলমান এসব কার্যক্রমে ইউএনডিপি অবদান রাখতে চায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।